ফ্যাকাশে এক টিক 

নীলির আজ ২৫ তম জন্মদিন। ঠিক রাত ১২ টায় ওর ফোন নম্বরে আজ শেষ আশা নিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠালাম। কিন্তু আমার এই জন্মদিনের বার্তা কি আদৌ পাবে? বিগত দুবছর ধরেই তো ওই নম্বর অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে আছে। যে কোথায় মিলিয়ে গেছে তা কেউ জানে না, ওর পরিবার পরিজন, আমরা বন্ধুবান্ধবীরাও না। বা হয়তো জেনেও না জানার ভান করে আছি!

          উত্তর কলকাতার মেয়ে ছিল নীলি। নবম শ্রেণিতে আমাদের আলাপ, কিছুদিনের মধ্যেই অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম আমরা। দেখতে খুব রোগা, গায়ের রঙটা চাপা, মাথায় লম্বা চুল হলেও সামনের দিকে চুলের ঘনত্ব বেশ কমই ছিল। কিন্তু ওর কথাবার্তা, বাস্তব সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান, মানসিক পরিপক্বতা দেখলে মনেই হতো না একজন কিশোরী। তবে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে স্কুলে ওর কোনো বন্ধু ছিল না। সারাদিন স্কুলে চুপচাপ একা একা সময় কাটাতো। সহপাঠীরা বলতো অহংকারী, কারোর সাথে কথা বলে না, ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক।তবে মেশার পর বুঝলাম ভীষণ খোলা মনের ছিল, একটুও অহংকার ছিল না। শুধু কেমন যেন সারাদিন দিবাস্বপ্নে মশগুল হয়ে থাকতো।

           কৈশোরের ছোঁয়ায় শারীরিকমানসিক যে সব পরিবর্তনের কারণে ক্ষণস্থায়ী আকর্ষণ কিছু উদ্ভট আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে আমরা যা কিছু করি, এবং প্রকাশ্যে বলতে ভয় লজ্জা পাই, সেসব কথা কী সরলভাবে নির্দ্বিধায় বলে দিত। লজ্জা, ঘেন্না, ভয়কিচ্ছু ছিল না মেয়েটার। যেকোনো বয়সী মানুষদের সাথে যেকোনো জটিল আলোচনায় যোগ দিতে পারতো। ফলে কেউ ওর প্রশংসা করতো, আবার কেউবা বলতোখুব পাকা মেয়ে!

         ওর আরেকটা বৈশিষ্ট্য যেটা না বললেই নয় তা হলো ওর হাসি। স্কুলে দেখতাম প্রায় সারাদিন ধরেই কারণেঅকারণে মুখে চাপা দিয়ে হেসে যাচ্ছে। খুব সিরিয়াস সময়েও। কারণ জিজ্ঞেস করলেই বলতো -“আরে হাসা তো ভালো, মন ভালো থাকে। একটু পাগলামী না করলে কি হয়!” অথচ আমরা জানতামই না ওরকম হাসি নাকি সোশ্যাল এংজ়াইটির উপসর্গ। তবে জানতো, শুধু প্রকাশ করতো না আমাদের সামনে। মাঝে মাঝে মনে হতো আমি নামেই ওর বন্ধু, তো আমাকে কিছুই বলতে চায় না নিজের বিষয়ে।

          এভাবেই দেখতে দেখতে মাধ্যমিক পাশ করলাম। একাদশে নিলো বিজ্ঞান আর আমি বানিজ্য। এই পার্থক্য আমাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারেনি। 
নীলি পড়াশুনোয়ও বেশ মেধাবী ছিল। যদিও বলতোমেধাবীবলে নাকি কিছুই হয় না! বৈজ্ঞানিক নানান মডেল বানানোর প্রতি ওর খুব আগ্রহ ছিল। ওর ইচ্ছে ছিল রোবোটিক্স ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। ওর জীবনযাপন, কথাবার্তা শুনে মনে হতো ওর জীবন তো দারুণ মজার। দুঃখ যেন ওকে স্পর্শই করতে পারতো না।

           উচ্চমাধ্যমিকের পর আমি চলে এলাম কলেজে বানিজ্য বিভাগে স্নাতক করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সর্বোভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলো না। তবে ভেঙে না পড়ে পুনরায় প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। সেই থেকে আমাদের মধ্যে একটু একটু করে দূরত্ব বাড়তে লাগলো। দুবছর কেটে গেলো, খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। এরপর হঠাৎ একদিন ওর ফোন কল পেলাম। প্রায় আড়াই ঘন্টা জমিয়ে গল্প হলো। ইঞ্জিনিয়ারিং এর দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে শুনে খুব ভালো লাগলো। কী একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বানাচ্ছে শুনলাম, পথকুকুরদের জন্য। শীতের রাতে যাতে ওরা ঘুমোনোর জন্য একটু উষ্ণ স্থান পেতে পারে। ছোটো থেকে ওর জীবনের প্রথম ভালোবাসা বলতে ছিল সুউচ্চ পর্বত এবং সারমেয়। সেই পথকুকুরদের জন্য কিছু একটা করতে পারবে বলে বেশ খুশি ছিলো। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে নাকি সেটা সম্পূর্ণ করা একটু চাপের হয়ে যাচ্ছিলো। এরপর আরো কিছু দিন কেটে গেলো। আমি আমার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

           ৬ই ডিসেম্বর, কলেজের একটি দীর্ঘ সেমিনার সেড়ে সন্ধ্যা টা নাগাদ ফেরার পথে সল্টলেকের এক রাস্তা থেকে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলাম। দেখি ওপার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে নীলি। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আর এগিয়ে গিয়ে কথা বলা হয়নি। বাড়ি ফিরে ফোন করবো ভাবলাম। গাড়িতে করে ফেরার পথে সময় দেখতে গিয়ে ওর দেওয়া হাতঘড়িটায় দেখলাম সময় ৭টা ১৫ মিনিটে থেমে গেছে। দুঘন্টা পর বাড়ি ফিরে ওর নম্বরে ফোন করলাম। নট রিচেবেল! তারপর বহুদিন আর ওর কোনো খোঁজ নেই। চিন্তিত হয়ে স্কুলেরই বিভিন্ন দিদিমণি, সিনিয়ার দিদিদের থেকে ওর খোঁজ করতে চেষ্টা করলাম। ওর একটা ছেলে বন্ধু ছিল অর্ক। ওর বাড়ির কাছেই থাকতো। সিনিয়ার দিদির মাধ্যমেই অর্কর সাথে যোগাযোগ করলাম।

           তারপর যা জানতে পারলাম তা অপ্রত্যাশিত। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একটি মাত্র ছোট্ট ঘর। সেখানেই থাকতো বাবা মাকে নিয়ে। ঘরের এক কোনায় একটা ডেস্ক আর তাতেই তারগুচ্ছ, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার ইত্যাদি নিয়ে ছিল ওর একটা গোটা জগৎ, প্রযুক্তির জগৎ। পারিপার্শ্বিক পরিবেশে অশিক্ষা এবং শিক্ষা সচেতনতার অভাব স্পষ্ট। সেরকম একটি পরিবেশ থেকে উঠে আসা মেয়ে নীলি। অল্প বয়সেই দেখা ব্যাপক পারিবারিক ঝামেলাঅশান্তি মেয়েটাকে চরম একাকীত্বে ঠেলে দিয়েছিলো। মা বাবা থাকা সত্ত্বেও কেমন একটা অনাথ বাচ্চার মতো ছন্নছাড়াভাবে দিন কাটাতো। মানসিক অবসাদ, ট্রমা ক্রমশ ওকে গ্রাস করছিলো। তাই যেটুকু সময় বাইরে থাকতো প্রাণ ভরে জীবনের অস্তিত্ব উপভোগ করতে চেষ্টা করতো। খুব খুব হাসতো আর অন্যদের হাসাতো। হাসিটুকুই তো ছিল ওর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

           ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চাকরি করে সামান্য টাকা রোজগার করে মা বাবাকে ভালো একটা জীবন দিতে চেয়েছিল ও। কিন্তু এর মাঝেই মনের মধ্যে বাসা বাঁধা অদৃশ্য এক রোগের সাথে একা একা লড়াই করতে করতে মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু তবুও হার মেনে নেয়নি। কলেজে পড়াকালীন ইন্টার্নশিপ করে, স্কলারশিপের টাকা দিয়ে, এবং মাত্র ৫০ টাকার বিনিময়ে দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে রোজগার করে তিনজনের সংসার চালিয়ে গেছে। একবার আর্থিক অবনতির কারণে অর্ক প্রাইভেট পড়া ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন নীলি নিজের বই, খাতানোটস্ দিয়ে, এবং পড়া বুঝিয়ে দিয়ে ওকে সাহায্য করেছে বেশ কিছুদিন।

          খুব কাছের হয়ে উঠেছিল অর্কর। অর্ক ওকে মনে মনে নাকি ভালোও বাসতো। কিন্তু সেটা কখনো প্রকাশ করতে পারেনি। কারণ তার ভগ্ন হৃদয় থেমে গেলে নীলির কষ্ট আরো শতগুণ বেড়ে উঠবেএই ভয়ে। হ্যাঁ, অর্ক হৃদরোগী ছিল। নীলিও জানতো ওর এই শারীরিক অসুস্থতার কথা। ওর যেকোনো সময় হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে সেবিষয়েও নীলি সচেতন ছিল।

বছরদুয়েক আগে অর্কর হঠাৎ হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপনের দরকার হয়ে পড়েছিল। অর্ক আমাকে বলে— “আমার এই অসুস্থতার খবরটা কোনোভাবে লীলির কানে পৌঁছায়। সেদিন আমি অজ্ঞান হয়ে কয়েক ঘন্টা হাসপাতালের বিছানায় পড়েছিলাম। মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছিলাম। হৃদপিন্ডদাতা পাওয়া যাচ্ছিলো না। তারপর যেদিন আমার জ্ঞান ফিরলো। পাশে বাবা বসেছিলেন। ছেলেকে জীবিত অবস্থায় দেখে অশ্রুসিক্ত চোখ আড়াল করে খুশি হয়ে বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেনআর বুকে যন্ত্রনা নিয়ে বাঁচতে হবে না আমাকে, হৃদয় আমার জীবনের গতিকে আর থামিয়ে দিতে পারবে না। এই বলে বাবা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বাইরে যান। খানিক বাদে বালিশের পাশে দেখি একটি রক্তে ভেজা চিঠি রাখা, তাতে লেখা -’আমার ভীষণ তাড়া আছে, তাই চিঠি লিখে রেখে যাচ্ছি। ঘুম ভাঙলে দেখে নিস। তোকে আর হৃদরোগে কষ্ট পেতে হবে না রে। তুই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবি দ্রুত। আমি বহুদূর চলে যাচ্ছি, বুঝলি, পাহাড়প্রেমী মানুষ তো, হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। কিন্তু তোর সাথে আমি সবসময় আছি। তাই চাপ নিবি না কোনো। সুস্থ হয়ে আমার মা বাবাকে আর পাড়ার কুকুর বিড়ালগুলোকে একটু দেখে রাখিস, নিজের এবং পরিবারেরও খেয়াল রাখিস। ইতিতোর প্রেম হরমোন যার জন্য ক্ষরিত হয়, সে আমি!’

তারপর শুনলাম সেদিনই নাকি হাসপাতালের কাছাকাছিই এক রাস্তায় গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনায় এক তরুণী ব্যাপকভাবে আহত হয়। এই হাসপাতালেই তাকে নিয়ে আসা হলে জানানো হয় তার ব্রেইন ডেথ হয়েছে। সেই মৃত্যুপথযাত্রীই হয়তো আমার হৃৎপিন্ডদাতা! তার নাম আজও অজানা। এই চিঠিটাই বা এলো কীভাবে তাও জানিনা। এখন নীলি কোথায় আছে, কেমন আছে, জানিনা কিছুই! শুধুই ওকে অনুভব করতে পারি আমার হৃদস্পন্দনে।

আমার বুকের ভিতরটা আঁতকে উঠলো। জানতে চাইলাম -‘এটা ঠিক কবে ঘটেছিল?’

উত্তর এলোডিসেম্বরের কোনো এক সন্ধ্যার টা নাগাদ। দুর্ঘটনার স্থান সল্টলেকেরই এক ব্যস্ত সড়ক!

            
সকালে অ্যালার্মের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি অজস্র নোটিফিকেশনের ভিড়ে চাপা পড়ে গেছে ওর সেই নিঃশব্দ চ্যাট বক্সটা আর তাতে আমার শুভেচ্ছা বার্তা পর্যবসিত হয়েছে একটি মাত্র ধূসরফ্যাকাশে টিকচিহ্নে এবং একটি লাল হৃদয় নীরবে নীলিয়ে গেছে।

Name- Ankita Sen
Class- XI
Age – 17
School – 
Baranagar Rajkumari Memorial Girls’ High School