ভদ্র সমাজের প্রচলিত গাল -খিস্তি (স্ল্যাং), লিঙ্গ হিংসা ও আমাদের প্রাত্যহিক যাপন
Author
সাবনূর সনম কামিনী
শিরোনামটি দেখে আমাদের মধ্যেকার ‘ভিক্টোরিয়ান মরালিটি’ হয়তো এতোক্ষণে ভ্রু-কুঁচকে মনে মনে বলতে শুরু করেছে শেষ-মেশ “গাল-খিস্তি” নামক “অশ্লীল” বিষয় নিয়ে লেখালিখি,তাও আবার ভদ্র সমাজকে উল্লেখ করে…! তবে এখন ‘ভিক্টোরিয়ান মরালিটি’-কে মগজ থেকে নামিয়ে একটু দেখা যাক ‘ভদ্র সমাজ’ বলতে ঠিক কী বোঝায়? ভদ্র সমাজকে সংজ্ঞায়িত করার ধৃষ্টতা তো আমার নেই, তবে একটা জলজ্যান্ত ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি……যারা কথায় কথায় রাবীন্দ্রিক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বলে উদ্বাহু হয়ে লম্ফঝম্ফ করেন, যারা ঘরে স্ত্রীকে সোনার শেকলে বন্দী করে, সেমিনারে ‘women empowerment’ নিয়ে চমৎকার বক্তব্য রাখেন, ধর্ষণের প্রতিবাদ করতে রাস্তায় মোমবাতি মিছিল করেন, AC-র ঠান্ডা ঘরে বসে পরিবেশ দূষণ মোকাবিলার নীল-নকশা করেন, আকাশচুম্বী অট্টালিকার বিলাসী সোফায় হেলান দিয়ে সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখ -যন্ত্রণা নিয়ে কাব্য রচনা করেন, যারা শিরদাঁড়া বন্ধক রেখে অতি সন্তর্পনে গণতন্ত্রের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে চায়ের আসরে আড্ডা জমান, যাদের মার্জিত, শালীন কথ্য ভাষায় ইংরেজির অনুপাতটি বেড়ে যায়, কারণ তাদের বাংলাটা ঠিক আসে না, এবং সর্বোপরি যারা যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়ে গোপনে গোপনে খুল্লামখুল্লা হলেও প্রকাশ্যে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করাকে বা গাল -খিস্তি করাকে তীব্র অশ্লীলতা বলে মনে করেন……!!
মূলত যারা সমাজের নীচুতলার শ্রমজীবী মানুষ,যারা কায়িক পরিশ্রম করেন, তারা যৌনতা সূচক স্ল্যাং-কে ব্যবহার করেন শ্রমের কষ্টকে লাঘব করার প্রয়োজনে। তাই গাল -খিস্তির বিষয়টি মোটামুটি সমাজের নীচুতলার মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল ভদ্র-সমাজে গাল-খিস্তি তো নিষিদ্ধ, সর্বদা সামাজিক সেন্সরশিপের আওতায় থাকে, তাহলে শিরোনামে “ভদ্র সমাজের প্রচলিত গাল -খিস্তি” কেন লিখলাম? আসলে ভদ্রসমাজ মাঝে মাঝে “ভিক্টোরিয়ান মরালিটি”-কে শিকেয় তুলে সুযোগ পেলেই কখনো কখনো নিজেদের ভিতরকার পুঞ্জীভূত রাগ -ক্ষোভ উগরে দিতে, কখনো কাউকে মৌখিক আক্রমণ করতে, কখনো বন্ধু-বান্ধবের আড্ডায় চটুল কৌতুক বা মজা করতে দু-চারটে যৌন-রগরগে গাল-খিস্তি আওড়ে থাকেন, না হলে তাদের মানসিক শান্তি আসে না দিনের শেষে। প্রতিদিন রাস্তা -ঘাট, স্কুল, কলেজ, ট্রেন -বাস, মন্দির -মসজিদ, রাজনীতির ময়দান সর্বত্র গাল -খিস্তি প্রয়োগের ঘনঘটা আমরা প্রতিনিয়ত দেখে থাকি, এবং প্রতিনিয়ত দেখতে দেখতে ভদ্রসমাজে এটা খুব নর্মাল একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে স্ল্যাং-এর সাথে ঐ তথাকথিত “অশ্লীলতা”, “অশালীনতা” সবসময় কিন্তু সম্পর্কিত নয়।প্রকৃতপক্ষে এটা নির্ভর করে শব্দটাকে কীভাবে, কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর।আমরা দেখবো যে ‘অশ্লীল’ শব্দ প্রয়োগভেদে স্ল্যাং হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে, আবার ‘শ্লীল’ শব্দ ব্যবহারের মারপ্যাঁচে স্ল্যাং হিসেবে গণ্য হতে পারে। যেমন –যখন একজন চাষী তার স্ত্রীকে বলছেন, “ওরে মাগী ভাত খোল রে, মাঠ থেকে আইছি”, তখন কিন্তু “মাগী” শব্দটি নেহাত স্বাভাবিক সম্বোধন হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু যখন একজন ভদ্র সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত ছাত্র তার ক্লাসের সহপাঠিনীকে উদ্দেশ্য করে বলছে : “এক্কেবারে আনারকলি, ডবকা মা*ল” ,তখন কিন্তু এটি আক্ষরিক অর্থেই স্ল্যাং, যেখানে এই যৌনগন্ধী বাচনিক মন্তব্যের মাধ্যমে নারী শরীরকে ধর্ষকামী দৃষ্টিতে লেহন করা হচ্ছে। তো বোঝাই যাচ্ছে যে –অশ্লীলতা ও স্ল্যাং সবসময় একই মুদ্রার উভয় পিঠ একথা ভিক্টোরিয়ান শালীনতার ধারণার একটি নির্মিত মিথ।
আমরা দেখবো বাংলা ভাষায় প্রচলিত স্ল্যাং-এর অধিকাংশই নারীর শরীর, মনস্তত্ত্ব, কর্মদক্ষতা, সামাজিক অবস্থান কিংবা তাঁর যৌনতাকে কটাক্ষ করে আবর্তিত। যা যৌন-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে নারীর উপর সংঘটিত যৌন হিংসার ঘটনাকে স্বাভাবিকীকরণ করছে। বাংলা স্ল্যাং-এ মেয়েদের নিয়ে নানা রকম শব্দের যে প্রাচুর্য তাতে মেয়েদের “মাল” বা উপভোগের জিনিস হিসেবে দেখার প্রবণতাই বেশি। মাল কথার অর্থ পণ্যদ্রব্য। যেহেতু অন্য অনেক পণ্যের মতো নারীও বিনিময়যোগ্য তাই তার সমার্থক হয়ে দাঁড়ায় “মাল”। আসলে ভদ্রসমাজে নানা সামাজিক এবং নৈতিক প্রতিবন্ধকতার জন্য নারীকে ভোগ করার যৌনাকাঙ্ক্ষা যখন অবদমিত হতে থাকে, ঠিক তখনই নারীর দেহকে কেন্দ্র করে নানান যৌনগন্ধী স্ল্যাং উচ্চারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ধর্ষকামীতাকে তৃপ্ত করে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের মানসিক নিগ্রহের (psychological violence) শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা স্ল্যাং-এর মাধ্যমে, যেমন -মাল (আকর্ষণীয় নারী), বন্ধ্যা/বাজা (সন্তান নেই যার), পোড়ামুখী (খারাপ ভাগ্য যার), ডাইনী, খান*কী বা বেশ্যা, ছিনাল, কুটনি, অসতী, নটী, ব্যাভিচারিণী, কুলটা, পতিতা, ভ্রষ্টা, নষ্ট মেয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমরা যখন দেখি কোনো ছেলে পৌরুষের ছক ভেঙ্গে কোমল আচরণ করছে, সাজতে চাইছে, তখনই তাঁর স্বভাবকে “মেয়েলি” স্বভাব বলে বা “মেয়েলোক”, “মেয়েছেলে’’ “হাফ-লেডিজ” ইত্যাদি বলে কুৎসিতভাবে অপমান করা হয়। এর পাশাপাশি যেসব পুরুষ স্ত্রীর কথামতো চলে, তাদের উপহাস করে বলা হয় ‘স্ত্রৈণ’।এই শব্দটি প্রয়োগ হয় পুরুষের জন্য নেতিবাচক, অসম্মানজনক, অগৌরবজনক হিসেবে।
বর্তমান দিনে ছাত্র সমাজের মধ্যে আড্ডা ইয়ার্কির ছলে যে স্ল্যাংগুলি প্রয়োগ করা হয় তার বেশিরভাগটাই নারী অঙ্গ মূলত যৌনাঙ্গের প্রতি লালসা-জ্ঞাপক শব্দ, বিকৃত কাম মানসিকতাই স্ল্যাং-এর অনেকটা অংশ জুড়ে আছে, তাই নারীর স্তন, নিতম্ব ,যৌনাঙ্গগুলিই স্ল্যাং-এর কেন্দ্রবিন্দু।ছেলেরা মেয়েদের নিয়ে যেসব মজা করে সেগুলো ভীষন রকম সেক্সিস্ট হিউমর হয়ে থাকে, যেমন কলেজের হালকা গড়নের মেয়েটিকে নামকরণ করা হয় “নি-মাই” (স্তনহীন নারী),আর একটু ভারী গড়নের মেয়েটিকে ডাকা হয় “লাউ” নামে। এই ধরনের যৌন রসিকতা যৌন বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয় , যৌন অপরাধকে প্রত্যক্ষ ইন্ধন জোগায়, তাই নয় কি? এছাড়া “….মেরে দেবো”,”লাগাবো”, “খেলা হবে” বা ”ব” সূচক শব্দ এগুলো ইশারা ইঙ্গিতে বলার মাধ্যমে ছাত্রসমাজের মধ্যেকার সুপ্ত ধর্ষনেচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শব্দগুলোর এতই আধিক্য,নর্মালাইজড, যে অনেকের কাছে এটি মুদ্রাদোষে দাঁড়িয়ে গেছে। আমরাও নির্বিবাদে মৌন শ্রোতা হয়ে গেছি। আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে “সুযোগের অভাবে চরিত্রবান”(ভদ্রলোক শ্রেণীর একাংশ) এই আমাদের ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা যৌন লালসা প্রজ্বলিত হয়ে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায়, আর অতৃপ্ত লালসা তৃপ্ত হয় ইভটিজিং বা গালাগালির মাধ্যমে। এরাই আবার দলবেঁধে হুক্কাহুয়া রবে “we want Justice” শ্লোগান তুলে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলনের দাবানল জ্বেলে দেয় “GENDER JUSTICE”-এর জন্য। কি অসাধারণ দ্বিচারিতা আমরা লালন করছি।
বর্তমানে আমাদের রাজ্য রাজনীতির দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাচ্ছি অকথা-কুকথার কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছে অবিরত, তার উপরে রাজনীতির রাঘববোয়ালদের মুখে অকথ্য স্ল্যাং-এর মাধ্যমে মা -বোনকে তুলে হুমকি থ্রেটের কালচার যৌন বিদ্বেষকে কতোখানি প্রশ্রয় দিচ্ছে ভাবলে শিহরিত হতে হয়।
আসলে ভিক্টোরিয়ান শালীনতাবোধের মুখোশ পরে থাকলেও ভদ্র সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত রুচিশীল সংস্কৃতিমনস্ক দু’পায়ে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবী কিছু প্রাণীর মুখোশের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকে এক বিকৃতকাম মানসিকতা, সুযোগ পেলেই মুখোশের আড়াল থেকে গলগল করে নির্গত হয় নারীদেহ সূচক যৌনগন্ধী স্ল্যাং-এর ফুলঝুরি। এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অদ্ভূত দ্বিচারিতা দেখা যায়, এই সমাজ একহাতে নারীকে মাতৃজ্ঞানে, পূজা করে আবার পিতৃতান্ত্রিক লক্ষ্মণ রেখা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে যে নারী তছনছ করে দিতে চাইছে স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণের ছক, তাকে ‘বেশ্যা মা*গী’ বলে গালি দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললেই তাকে ‘ডাইনি’ বলে পুড়িয়ে মারে, প্রশ্নহীন আনুগত্যের বাইরে যেতে চাইলে তাকে ‘ছিনাল’ বলে তার জিভ কেটে দেয়, ‘অসতী খান*কি’ বলে জীবন্ত কবর দেয়। আবার ছাত্র সমাজের ইভটিজিং-এর পরিভাষাগুলো সমাজ উদারচিত্তে প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে সমাজে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও যৌন হিংসার ঘটনা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে! তাহলে দেখা যাচ্ছে যৌন হিংসার মূল শেকড় দাঁড়িয়ে আছে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাভাষ্য নির্মিত গাল-খিস্তির রগরগে উর্বর মাটির ভিতরে। তাই মাটির উপরে “রাত বারোটার নিষেধাজ্ঞা”র বেড়া দিলে কি যৌন -হিংসা রোখা যাবে?? এর উত্তর আশা করি আমাদের ভদ্রসমাজের কাছে অজ্ঞাত নয়। কি কি পদক্ষেপ নিলে এই সমস্যার সুলুক সন্ধান মিলতে পারে ভদ্র সমাজের জাগ্রত বিবেক সেই উত্তর ভালো দিতে পারবে, শুধু একটি বিনীত প্রশ্ন রেখেই আপাতত ইতি টানবো: নারীকে শরীর সর্বস্ব প্রোডাকশন মেশিন , যৌনবস্তু হিসেবে না দেখে একটু মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা কি গড়ে উঠতে পারে?
#সমগ্র লেখাটি পড়ার পর হয়তো ভদ্র সমাজের দু’একজন সদস্য রেগেমেগে একটি মার্জিত খিস্তির তীর ছুড়তে পারেন আমার দিকে, লেখাটি “ফেমিনিস্ট” টাইপের হয়ে গেলো।(আজ্ঞে, হ্যাঁ বন্ধু, গালির পরিভাষায় এখন নতুন একটি গালির সংযোজন ঘটেছে “নারীবাদী” বা “ফেমিনিস্ট”!)
( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)