অদম্য স্বপ্ন জয় কামিনী 

[ কামিনীর চরিত্রে দিয়া দাস, এক অপ্রকাশিত গল্প]

ক্রিং! ক্রিং! ক্রিং!…… আধ ঘন্টা ধরে ভোর ছটায় এলার্ম টা বেজে চলেছে একইভাবে। আজ আবার সেই সোমবার। কিন্তু সকাল থেকেই শরীরটা আর মন একসাথে সারা দিচ্ছে না। বাইরে কাল রাত থেকে হয়ে চলা ঝোড়ো মুষলধারায় বৃষ্টির বেশ কিছুটা কমেছে। এইরকম স্নাত, স্নিগ্ধ, শান্ত পরিবেশে শরীর বলে উঠলো, “আজকে আর অফিস যাস না, একটু বিশ্রাম কর। “ কিন্তু তারপরই মন বলে উঠলো, “এবার আর যদি বেশি আরাম করিস তাহলে কালকের মত আবার আজকেও বস্ এর অকট্য ভাষা শুনতে হবে, সাথে ওই সামান্য বেতনের টাকাটাও কেটে নেবে । তার মধ্যে মাসের প্রথম দিক। আর অফিস না গেলে সে কি হতে পারে সেটা তুই ভালোই জানিস। “ মন আর শরীরের এই কথা কাটাকাটি শুনতে শুনতে আরো কিছু সময় বিছানাতেই গড়িয়ে গেল। পাশের দেয়াল ঘড়িতে হঠাৎ চোখ পড়তেই দেখলাম সময় প্রায় ৬:৫০। তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। সারা সপ্তাহ কাজের পর রবিবার  রাতে শুলে ঘোমটা জোরালো ভাবে চেপে ধরে। শরীর চায়না খুব শীঘ্র রাত পার করে সোমবারকে গ্রহণ করতেইশশশ‘….যদি আরো কিছু সময় রাতের গহীন অন্ধকারটা থাকতো কিন্তু সময় তো আর আমার মত কারোর অধীনে চাকুরীর নয়, সে নিজেই নিজের মালিক, তাই তার  তাৎপর্যকে মেনে নিয়ে আমাকে থুরি আমাদের সবাইকে চলতে হয় শেষবারের মতো ঘড়িটা দেখে নিলাম ৯টা বেজেই গেল আজওঅতএ আজকের এই মহাযুদ্ধের বিজয়ী হল মন 
বিছানাটা কোনরকমে গুছিয়ে রেখে চলে গেলাম ফ্রেশ হতে আর হ্যাঁ স্নানটাও একেবারে করেই বেরোই  কোনমতে বাথরুমের সব কাজ করে বেরিয়ে পুজো করে চলে গেলাম রান্নাঘরে হাতে সময় থাকলে দুপুরের খাবার বানিয়ে যাই অফিসে আর না হলে না খেয়ে কেটে যায় এরকম তো কতদিনই হয় এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসবে যে, “মা কেন সাহায্য করে না?” আসলে আমারই বলা হয়নি যে বলা হয়নি যে,আমি কাজের সূত্রে কলকাতার একটি ছোট ঘরে ভাড়া নিয়ে একা থাকি, আর আমার বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনার একটি ছোট্ট জায়গায় আজকের সময় খুব কম থাকায় দুপুরের খাবার হিসেবে গতকাল রাতের ভাত ভাজা গরম করে বসিয়ে দিই এবার সকালের খাবার হিসেবে একটা কলা খেতে খেতে তৈরি হতে থাকলাম।এরপর ব্যাগ নিয়ে বাইরে এসে টিফিন বক্সে  ভাত, ভাজা নিয়ে নিলাম এবং সাথে একটা আপেল জুতো পড়তে পড়তে দেখি ঘড়ি :৪৫ হয়েছে জানান দিচ্ছে মনে মনে ভাবছি, “যেতে এক ঘন্টা লাগবে, তারপর জ্যাম, আজও হয়ে গেলটানা  বছর ধরে প্রতিদিন এই সময়টা যেন আলোর গতি বেগের চেয়েও দ্রুত বয়ে যায় কিন্তু ভাগ্য সাথ দেওয়াতে আজ সময়মতো অফিস পৌছালাম 

কিন্তু…. আমার কপাল তো মহার মূল্যবান ধাতু দিয়ে আবৃত তাই কাজের মাঝে হঠাৎ খবর আসে যে এই মাসের মাইনে আসতে দু তিন দিন দেরি হতে পারে।  কারণ কি? ….. কারণ নাকি অফিস সার্ভার সমস্যা করছে, ব্যাংকের সাথে এটা শোনার পর আমার চারপাশটা যেন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেলমাথাটা ঝিম ধরে এলো….। 
দায়িত্ব : কিরে, কালকে তো বাড়ির ভাড়া ইএমআই এর তারিখ কি করবি এবার তুই?
কর্তব্য : তোর বাড়িতে টাকা পাঠাবে কি করে!!! বাবা মা এর ওষুধ, বাজার, মাসকাবাড়ি এছাড়াও আর যা যা সংসারিক জিনিস সবই তো প্রায় শেষ কাল মা ফোনে বললো এবার ???
স্বপ্ন : তুই তো আমাকে, ছোটবেলার ইচ্ছা সবকিছুকে ত্যাগ করেছিলি এই চাকরি, দায়িত্ব, কর্তব্য এর জন্য এবার কি কি হবে এসববের ???
মন: এবার তোদেরকে আমি কিছু বলি ;একটু শুনবি!?  
দায়িত্ব, কর্তব্য, স্বপ্ন সবাই একসাথে এতে হ্যাঁ সূচক সম্মতি প্রকাশ করে 
মনযখন প্রাণের প্রথম সঞ্চার হওয়া শুরু হয় মাতৃ গর্ভে তখন থেকেই হয়তো আমি 
তার সাথে জুড়ে যাই, তাই সবাই বলে মনপ্রানকিন্তু এই মনের উপলব্ধি সম্ভবত শুরু হয় সেই শিশুর বোধশক্তি জন্মের মুহূর্ত থেকে ওর বয়স যখন তিন বছর তখন ওর একটা অসুখের জন্য ডাক্তারের কাছে যাই খেলার ছলে নাকি আত্মার টানে জানিনা, কিন্তু তার কাছ থেকে চেয়ে প্রথম স্ট্যাটাস্কোপ কানের নেয়, শুনতে পায় আমার হৃদস্পন্দন সেদিন থেকেই যেন আমার সেই স্পন্দন বলে ওঠে অমোঘ আকর্ষণ, এক স্বপ্ন আর এক লক্ষের কথা তখন থেকেই ওকে যখন জিজ্ঞেসা করত কেউ যে বড় হয়ে কি হতে চাস…, ওর ভিতর থেকে বলে উঠতাম, “ আমি ডাক্তার হতে চাই ”  আর চোখের থাকতো নিজের স্বপ্নের, লক্ষ্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, ভরসা ভরসা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এই স্বপ্নকে আগলে নিয়ে বড় হয়ে ওঠে , কৈশোর থেকে বয়ঃসন্ধি সময় পেরিয়ে যায় আস্তে আস্তে মাধ্যমিক  উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় প্রস্তুতি শুরু করে ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষার সবকিছু উজাড় করে দেয় ৬ই মে, পরীক্ষার দিনের জন্য কিন্তু পরীক্ষার দিন ঘটে যায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নিজের প্রতি বিশ্বাস, মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে, ভগবানকে প্রণাম করে বাবার সাথে বেরিয়ে পড়ে পরীক্ষা দিতে যাবার সময় তারা যে ভাড়া করা গাড়িটায় করে যাচ্ছিল সেটাকে ধাক্কা দেয় একটি মাতাল ড্রাইভার চালিত ট্রাক হসপিটালে যখন তার জ্ঞান আসে তখন দেখে  তার বড় ক্ষতি না হলেও সামনে থাকা গাড়ির ড্রাইভার আর বাবার ক্ষতি হয় বাবার একটা পায়ের কিছুটা বাদ পড়ে যায়  তার দরুন চলে যায় বাবার চাকরি আর্থিক অবস্থা ধসে পড়ে  সারাদিন রাত কাঁদতো একদিকে বাবার এই অবস্থা  অন্যদিকে পরীক্ষা না দিতে পারার কষ্ট প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও কিছুদিন পর মা বলে, “একটা কোন কাজ বা চাকরির ব্যবস্থা কর, না হলে সংসার আর বাবার চিকিৎসা চালানো যাবে না আর তোকে কাজ খুঁজতে হবে কারণ আমি তো তোর বাবাকে ছেড়ে একা করে যেতে পারবো নাএই কথা শোনার পর সেদিন  কিছু খেতে পারেনি, ঘুমোতে পারিনি, শুধু পাথরের মত শক্ত হয়ে যায়, চোখ থেকে এক ফোটা জল বেরোয় না সেই দিন থেকে স্বপ্নতোকে চির বিদায় জানিয়ে, তোদের দুজনে কর্তব্য দায়িত্বকে গ্রহণ করে চিরদিনের জন্য একমাত্র আমি জানি  ঠিক কতটা কষ্ট পেয়েছিল স্বপ্নকে, লক্ষ্যকে ত্যাগ করার জন্য কাউকে কিছু বলতে পারিনি, কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি সেদিন, আজও পারেনা, ভবিষ্যতেও পারবেনা একটা চাকরি খুঁজে সবার সব দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল নিজের ছোট্ট হাতে জানিস, আজও যখন সেই পরীক্ষার দিন, রেজাল্টের কথা শুোনে সেদিন খেতে ঘুমোতে পারে না সেই বিভীষিকাগুলো গলায় চেপে রাখে না ঝরে পড়া অশ্রুগুলোকে ’ এত কষ্ট চেপে রাখার গল্প কেউ জানে না, তোরাও না, হয়তো মাবাবাও না শুধু আমি….
হঠাৎ কিছু কথোপকথনে আমি চোখ খুলে দেখি অফিসের মেডিকেল রুমে শুয়ে আছি কি হয়েছিল সেটা প্রশ্ন করাতে জানতে পারি যে, বেতন দেরিতে আসবে শুনে এই চাপটা সহ্য না হাওয়াতে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই এবং প্রায় অনেকক্ষণ অজ্ঞান থাকি, আর দশ মিনিটের মধ্যে জ্ঞান না আসলে হসপিটালে ভর্তি করাতে হতো আর আমি নাকি অজ্ঞান অবস্থায় মাঝে মাঝে হালকা বলছিলাম আমি একজন ডাক্তার হব, টেটাস্কোপ দিয়ে হৃদ স্পন্দন শুনবো ’ কিন্তু আমি তো আজ কয়েক বছর হল চাকরি করছি, তাহলে এই কথার মানে কি হয় সেগুলো আমি অজ্ঞান অবস্থায় অজান্তে বলেছি আমি যখন এই বিষয় নিয়ে ভাবছি তখন কিছু জন সহকারি আমাকে এসে বলে যে, সার্ভার ঠিক হয়ে গেছে, তাই বেতন সন্ধ্যাবেলা সবার একাউন্টে পৌঁছে যাবে।শুনে মনটা একটু হালকা হলো ‘যাককককক’….
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, “এই মাসেও এইবারের মতো সবকিছু খরচ তাহলে চালিয়ে নিতে পারব ”
এখন কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আপনাদের কাছে, “আমি কি স্বপ্ন দেখেছিলাম কোন বিভীষিকা নাকি এই বিভীষিকা আমার অবচেতন মনের কোন গোপনে লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত সত্য, যা কেউ জানে না???
কিন্তু আমি কি সত্য অপ্রকাশিত ঘটনাটা আদৌ জানি নাকি আমিও অজ্ঞাত এই বিষয়ে??? কোনটা?????

Picture Courtesy: OpenAi

 
Name- Diya Das
Age – 17
Class – XI

Institution – Uttar Garifa Pallimangal High School. 

Open chat
1
How Can I Help You
How Can I Help You