দৈনন্দিনতার পরিসরে চায়ের দোকান ও সমাজে তার ইতিবাচক দিকগুলি

Author

তনুশ্রী রায়

সমাজ এমন একটা জায়গা যা আলোচনা সমালোচনা ছাড়া প্রায় অসম্পূর্ণ। সেই সমাজ বা বলা ভালো আজকের বর্তমান সমাজ যেখানে ৫/৬” ইঞ্চির একখান অতি আধুনিক মুঠোফোনে বন্দি, সেখানে সরাসরি বসে ঘন্টাখানেক আলাপ আলোচনা এখন আর দেখাই যায়না। কথাবার্তা বলতে ওই হোয়াটস্ অ্যাপ কিংবা মেসেঞ্জার। ঠিক এইসময় আমরা যদি উত্তর কলকাতা বা অন্যান্য জায়গার চায়ের দোকানের দিকে চোখ ফেরাই তাহলে আমরা দেখতে পাই যে উনুনে চায়ের ফুটন্ত ধোঁয়ার মধ্যে দিয়েই বাষ্পায়িত হচ্ছে সমাজ দর্পনের প্রতিচ্ছবি।

অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর ‘পথে প্রবাসে’ ভ্রমণ কাহিনিতে ফরাসি জাতির কাফে সংস্কৃতির মাহাত্ম্য তুলে ধরতে গিয়ে বাঙালির চা-খানা বা চায়ের দোকান আর একে ঘিরে জমে উঠা আড্ডা নিয়ে বেশ উচ্চাশা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, ফ্রান্সের সর্বত্র, বিশেষ করে রাজধানী প্যারিসের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য কাফে। কাফে হলো চা-কফির দোকান। অতি সস্তায় চা-কফি পান করতে করতে সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়া যায় প্রাণ খুলে। লেখকের মতে, ফ্রান্সের আধুনিক ইতিহাস নির্মিত হয়েছে তার কাফেগুলোতে। কাফে হচ্ছে ফরাসি সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কাফের আড্ডা থেকেই বেরিয়ে এসেছে নতুন নতুন মতাদর্শ, চিন্তাধারা, উদ্ভাবন-সূত্র আর জন্ম হয়েছে শিল্পী-সাহিত্যিকের। তবে ঔপনিবেশিক বাংলায় এই পানীয় হিসাবে চায়ের আগমন কিংবা চায়ের ঠেকের আগমন ছিল একটু অন্যরকম।‌ বাঙালি বা ভারতীয়রা অভ্যস্ত যেখানে ঘোল আর ঝোলে সেখানে বিদেশী পানীয় চায়ের জায়গা করে নেওয়াটা বেশ তাজ্জব ব্যাপার নয় তো কি ! যাই হোক এবার মূল আলোচনা প্রসঙ্গে আলোকপাত করি।

উপরোক্ত আলোচনায় আমরা দেখলাম লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায় ফরাসি ক্যাফের সাথে বাঙালির চায়ের দোকান বিষয়ক তুলনাটি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বাঙালির উচ্চবিত্তের আত্ম-অহঙ্কারের সহিত যে পানীয় পান করা হতো তা পরবর্তী বিংশ শতকের শুরুর দশকগুলিতে হয়ে উঠল মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ পানীয়। চায়ের ঠেক বা দোকান হয়ে উঠলো বিপ্লববাদ ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক মৌখিক যোগাযোগের স্থান। যেখানে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষেরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে চা পান করছেন আর বিভিন্ন বিষয় সেখানে আলোচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পরবর্তী কালে কলকাতার চা আড্ডায় জোয়ার আসে নতুন নতুন পন্থা কিংবা কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন বিক্ষোভ কর্মসূচির উপর কেন্দ্র করে মিটিং মিছিলের জমায়েতে চা আর সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা দুটোই যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। এইসময় কলকাতার বুকে থাকা বিভিন্ন চায়ের দোকানে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল মূলত তৎকালীন নক্সাল আন্দোলন, ইন্দিরা গান্ধী প্রণীত আপৎকাল তথা এমার্জেন্সি আর সবচেয়ে বেশী তর্কের আসর বসতো বোধহয় বাঙালির ফুটবলকে কেন্দ্র করে।

তবে আজ এই একবিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে চোখ রাখলে আমরা আমাদের জীবনকে দেখতে পাই নিতান্ত একটি ৬ ইঞ্চির যন্ত্রে যা নিষ্প্রাণ কিন্তু রঙীন, তবে সেই রঙীনের ছোঁয়া বোধহয় আমাদের পারিপার্শ্বিক রঙীন জীবনকে ফিকে করে দিচ্ছে। এইসময় শান্তি ঠিক কোথায় এই ভাবনা নিয়ে আমরা যখন একটু গঙ্গা পাড়ে দুদণ্ড শান্তি খুঁজতে যাই তখন আমাদের সঙ্গী হয় মাটির ভাঁড়ে চা আর রঙ বেরঙের ইতিবৃত্তের আলোচনা। যখন আজকের যুবসমাজকে আমরা মুঠোফোনে বন্দি হতে দেখি তখন আমরা উত্তর কলকাতার গঙ্গার ঘাট গুলিতে চোখ রাখলে দেখতে পাই বেশ কটা ছোট্ট চায়ের দোকান, সাথে দুটো বেঞ্চ সেখানে চার পাঁচজন ছেলেমেয়ে বসে চা আড্ডায় নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে। ঠিক এমন করেই অলিগলি বা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের চায়ের দোকান গুলো আজও সমাজের জন্য একটা ইতিবাচক স্থানের দাবিদার হিসাবে থেকে যায়। রাজ্য রাজনীতি, খেলাধূলা, একটা ছোট্ট চায়ের দোকান কীভাবে সমস্ত পেশার মানুষদের এইসব বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা নিয়ে সবাইকে এক ছাতার তলায় উপস্থাপিত করছে, এর আর বিকল্প নিদর্শন বোধহয় আর অন্য কিছুতে চোখে পড়ে না। চায়ের দোকানে এই চর্চা চলতে থাকুক আর মুঠোফোনের বন্দি বা হাজারো ব্যস্ততার ঘেরাটোপে বন্দী জীবনে দুদণ্ড চা পান করতে গিয়ে আসুক বাস্তবতার এক অনন্য উপলদ্ধি, সমাজে যা ঘটে তা-ই চিত্রিত হয় এই চায়ের পেয়ালার বা মাটির ভাঁড়ের সমাজ দর্পনে…

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Picture Courtesy: pinterest.com

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাধারন কান্ডজ্ঞান ও তার বিপদ

testimonial
Authors

সঞ্চিতা দে

‘Common Sense Perception’ অর্থাৎ ‘সাধারণ কান্ডজ্ঞান’ ও ‘Scientific Knowledge’ অর্থাৎ ‘বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান ‘এই দুটি শব্দ সম্পর্কে আমরা কমবেশি সকলেই পরিচিত।

উল্লেখিত এই দুটি বিষয় সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রথমেই আমেরিকার একজন Psychologist-এর কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। যার নাম Garth J. Fletcher। তিনি তাঁর ‘Psychology and Common Sense’ নামের একটি প্রবন্ধে ‘Psychology’ এবং ‘Common Sense’-এর মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃতি নির্ধারণ করতে গিয়ে তিনি ‘Common Sense’ অর্থাৎ সাধারণ কান্ডজ্ঞানকে তিনটি প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করেছেন, সেগুলি হল—

  1. As a set of shared fundamental assumption.
  2. As a set of maxims or shared beliefs and
  3. As a shared way of thinking.

তিনি ‘Common Sense’-কে একেবারে মূল্যহীন বলে প্রতিপন্ন করেননি, বরং তাঁর মতে Common Sense-এরও মূল্য রয়েছে তবে একই সাথে কোন কোন ক্ষেত্রে তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। 

‘Journalist of Personality and Social Psychology’-এই প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়, Culture as common sense:Perceived consensus versus personal beliefs as mechanisms of cultural influence, যার লেখক ছিলেন Xi Zou Kim -Pong Tam, Michael W Morris প্রমুখ। সেখানে তাঁরা বলেছেন culture affects people through their perceptions of what is consensually believed অর্থাৎ মানুষের সাধারণ কান্ডজ্ঞান তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে সংস্কৃতির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এটি লক্ষণীয় যে সংস্কৃতি ভেদে মানুষের সাধারণ কান্ডজ্ঞানের মধ্যেও পার্থক্য থাকে।

‘Common Sense’ বা সাধারণ কান্ডজ্ঞান বলতে সাধারণ অর্থে মানুষের নিজের বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কার ধ্যান ধারণা এই সমস্ত কিছুকেই বোঝায়। সংস্কৃতি অনুযায়ী মানুষের এই সমস্ত বিশ্বাস সংস্কারও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়। বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানের ক্ষেত্রে কিন্তু তা কখনোই হয় না। যেটি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য (scientifically true) সেটি কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতেও একই রকমভাবে সত্য, সংস্কৃতি ভেদে কিন্তু তা কখনোই পৃথক হয় না

এই প্রসঙ্গে আরো একটি গ্রন্থের উল্লেখ করা প্রয়োজন Wim Lunsing রচিত Beyond common sense: Sexuality and Gender in contemporary Japan. এই গ্রন্থটিতে মূলত জাপানিদের জীবনধারার ওপর আলোকপাত করেছেন।

               এই গ্রন্থটিতে তিনি বলেছেন যে, জাপানে বিবাহ বা marriage এই প্রথাটিকে ভীষণ রকম ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।1986 সালে Wim Lunsing জাপানে বসবাস করা শুরু করেন তাঁর গবেষণাজনিত কাজকর্মের সূত্রে তখন তিনি 25 বছরের যুবক। যেখানে বসবাসকালীন  প্রায়ই  তাকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো, যে তিনি বিবাহিত কিনা এবং তিনি যখন জানাতেন যে তিনি বিবাহিত নন, তখন সেখানকার বাসিন্দারা ভাবতেন তাহলে নিশ্চয়ই তার গার্লফ্রেন্ড আছে। কিন্তু আদতে তিনি ছিলেন একজন “Gay”। অর্থাৎ একজন পুরুষের সাথে কেবল একজন নারীরই সম্পর্ক তৈরী হতে পারে এই ছিল তাদের ধারণা। এর বাইরেও যে পুরুষের সঙ্গে পুরুষের বা নারীর সঙ্গে নারীরও সম্পর্ক তৈরী হতে পারে, এটি ছিল তাদের ধারণার বাইরে। তাই লেখক বলেছেন–“This made me wonder how Japanese people in comparable situations deal with such questions and indeed, how they cope with an environment in which everyone is expected to marry.”এই বইটির বিশেষত্ব এটিই যে, লেখক নিজে একজন  ‘Gay’ হওয়া সত্ত্বেও, তিনি শুধুমাত্র তাদের উপরে আলোকপাত করেন নি। তিনি বিভিন্ন ধরনের মানুষের ওপর আলোকপাত করেছেন যারা সমাজের গতানুগতিক জীবন ধারার বাইরে গিয়ে জীবন ধারণ করেন। যেমন- Gay, lesbian, feminist women, mens liberationists, trans sexuals, transvestites এবং hermaphrodites। অর্থাৎ যারা জাপানিদের এই ‘বিবাহ’, এই প্রথার কট্টর ধারণার বাইরে গিয়ে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করে তারা সকলেই তাঁর আলোচনার বিষয় ছিলেন। এক কথায় বলা যায় বিবাহ প্রসঙ্গে common sense রয়েছে ,তার বাইরে যারা রয়েছেন তাদের জীবনযাত্রার ধরণই তিনি মূলত তার এই গ্রন্থটিতে তুলে ধরেছেন। জাপানিদের কট্টর ধারণার বিকল্প হিসেবে Wim Lunsing , তাঁর এই গ্রন্থটিতে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন যে, “The investigation of exceptions is eruclan when establising the importance of what people say is ‘normal’ or common sense.” অর্থাৎ তিনি বলেছেন সাধারণ মানুষ যে বিষয়গুলোকে সাধারণ কান্ডজ্ঞান থেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন সেগুলি ভাবতে হলে প্রয়োজন তার বিকল্প চিন্তা ধারা কাজকর্মকে খুঁজে বের করা এবং তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা যে, যে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষ যে বিষয়গুলিকে দেখেছেন এবং সত্য বলেছেন তার বাইরেও তার বিকল্প রয়েছে। যেমন তিনি তাঁর গ্রন্থে দেখাচ্ছেন যে জাপানি সমাজে বিবাহ পরবর্তী জীবনে নারী পুরুষের ভূমিকা কি হবে সেই বিষয়েও তাদের কঠোর মনোভাব রয়েছে। যেমন পুরুষ হলো সমাজে ক্ষমতাশালী আর নারীর অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা হবে শুধুমাত্র স্ত্রী হিসাবে এবং তার মাতৃত্ব এবং তিনি যাবতীয় গৃহের কার্য সম্পাদন করবেন, বাইরের জগতে তাঁর বিচরণ একেবারেই বারণ, সেখানে শুধুমাত্র পুরুষদের আধিপত্য। এটি হলো সেখানকার সমাজের মূল ধারার ভাবনা বা commonsensical idea of marriage.

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো মানুষের সব ধারণা তা কি সমস্ত সমাজে সমস্ত সংস্কৃতিতে একই রকমভাবে সত্যি? নাকি এর বিকল্প চিত্রও রয়েছে? এই প্রসঙ্গে বলা যায়, প্রথমত, সকলে বিবাহে বিশ্বাসী হন না, অনেক সময়েই বিবাহ না করেও একসাথে থাকার চিত্র আমরা দেখতে পাই। দ্বিতীয়ত, বিবাহ করলেও পুরুষ ও নারীর ভূমিকা সম্পর্কে যে গতানুগতিক ধারণা তাও বর্তমান সমাজে নস্যাৎ হয়ে যায়। সেখানে দেখা যায় নারীরা কেবল গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকেন না বা তাদের অস্তিত্ব শুধুমাত্র স্ত্রীরূপে বা মা রূপে প্রতিষ্ঠিত হয় না। আবার এই বিবাহ রীতিটির মধ্যেও সমাজ ও সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন হয়। কোন সমাজে যে প্রথা বৈধ আবার অন্য সমাজে তা অবৈধ বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও বর্তমানে homosexuality নিয়ে অন্য রকম ধারণা তৈরি হয়েছে। যা পূর্বে অবৈধ রূপে বিবেচিত হতো তা বর্তমানে আইনানুগভাবে বৈধতা লাভ করেছে। এই রকম বহু উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে যা সম্পূর্ণরূপে সত্য নয়, যা মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কারের মধ্যে দিয়ে সমাজ এবং সংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এবার আসা যাক, এই common sense বা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের বিপদের কথায়। পূর্বেই উল্লেখিত যে, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের অবশ্যই মানুষের জীবনে কোনো না কোনো ক্ষেত্রে মূল্য রয়েছে ঠিকই, তবে এর থেকে বিপদের আশঙ্কাও কিছু কম নয়। কয়েকটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টিকে বুঝে নেওয়া যাক, যেমন যখন depression তৈরি হয় তখন মানুষ সাধারণ কান্ডজ্ঞান থেকে সেই depression-টিকেই কারণ ভেবে তাকে সমাধান করার চেষ্টা করেন। তারা বোঝেন না আসলে depression সমস্যার কারণ নয় বরং ফলাফল। ফলে মূল কারণ উদ্ঘাটন না করে যখন ফলাফলটিকেই কারণ ভেবে তাকে সমাধান করার চেষ্টা করেন তাতে সমস্যাটিকে অতিক্রম করা সম্ভব হয় না বরং তার ফল হয় ভয়াবহ।

আবার নিত্যদিন আমরা ক্রমশ কিছু কাজ সচেতন অথবা অচেতনভাবেই করি যার প্রভাব আমাদের উপরেই পড়ে। যার কারণে জীবনে সমস্যার জন্ম হয়, যা সাধারন কাণ্ডজ্ঞানের মধ্যে দিয়ে বোঝা সম্ভব হয় না ফলতঃ সমস্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

সাধারণ কান্ডজ্ঞান থেকে নিজের সমস্যা নিজের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে নিজের মধ্যেই রেখে দেওয়ার যে প্রবণতা সেটিও কিন্তু মানুষের জীবনে সমূহ বিপদ ডেকে আনে। আসলে যে কোন ব্যক্তিগত সমস্যাই যে আসলে সমাজ থেকেই উৎসারিত তা সাধারণ কান্ডজ্ঞান থেকে বোঝা সম্ভব হয় না।

আরো একটি উদাহরণ যেমন, আমরা মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে খুব বেশি সচেতন না হলেও শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্কে আমরা সকলেই কম বেশী সচেতন। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন অসুখ নিয়ে মানুষের কুসংস্কার মানুষকে ঠেলে দেয় বিপদের দিকে। যেমন পক্স হলে যেখানে প্রোটিন খাওয়া প্রয়োজনীয়, সেখানে মানুষ কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেয়, ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার পরিবর্তে দেব-দেবীর আরাধনা করতে থাকে যার ফলে মানুষের সঠিক চিকিৎসা না হওয়ায় তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।

এরকম বহু উদাহরণ যা আমাদের চোখের সামনে নিত্যদিন আমরা লক্ষ্য করি। যে সমস্যাগুলি থেকে কখনোই সাধারণ কান্ডজ্ঞান থেকে অতিক্রম করা সম্ভব নয় বরং এর জন্য প্রয়োজন গবেষনালব্ধ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান। যার মাধ্যমে মানুষ নিজেই নিজের সমস্যা বুঝতে পারবে এবং সমস্যা থেকে অতিক্রম করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় কর্মপ্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারবে।

এই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের ধরন, সংস্কার, কুসংস্কার সমাজ, সংস্কৃতি ভেদে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, যা সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে পরিবর্তিত হয় না, যার প্রভাব সর্বত্র একই রকম। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন এটি এখন গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে যার প্রভাব সর্বত্রই সমান, যা সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে পরিবর্তিত হয় না। এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় বা এই ক্ষেত্রে এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য মানুষের কি রকম কর্মপ্রক্রিয়া গ্রহণ করা উচিত হবে সেটিও সকল সমাজ ও সংস্কৃতির জন্যও একই রকম হবে, যা সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে অপরিবর্তিত থাকবে।

তাই শেষে উল্লেখ্য যে, common sense জীবনে চলার পথে কোন কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঠিকই, তবে গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মানুষের জীবনের চলার পথকে সুগম করতে আরও অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

(মতামত লেখিকার ব্যক্তিগত।)

 

সূত্রঃ

  1. Psychology and common sense; By Fletcher, Garth s. American psychologist, vol.39(3),

(March 1984)

  1. Culture as common sense: perceived consensus versus personal belief as mechanism of cultural influence. journal of personality and social psychology, 94(4); By zou, x., Tam, k.- p, morris, m.w., Lee, s.-1., Lau, I. Y. M., Chiu, c -y. (2009)
  2. Beyond common sense: sexuality and gender in contemporary Japan; By win lunsing (2001)

 

ছবি সৌজন্যেঃ https://www.dreamstime.com/illustration/misconception-symbol.html 

 

………….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp